চন্ডাল লেখোয়াড়কে নব জীবন দিলেন মুখ্যমন্ত্রী

ধৃতরাষ্ট্র দত্তঃ সাহিত্য সৃষ্টির জন্য রাজ্য দেশ বিদেশের ৩৪ টি পুরস্কার রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। আর তাঁকেই কিনা বেঁচে থাকার জন্য স্কুলে রাঁধুনির কাজ করতে হয়। প্রচন্ড শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই জীবন ধারণের জন্য তাঁকে ওই রাঁধুনির কাজ করতে হত। তাঁর উচ্চ রক্তচাপ, শর্করা জনিত রোগ, দুই হাটুতে নিরিপ্লেশমেন্ট হয়েছে। সেই শারীরিক কারণে উনুনের কাছ থেকে সরিয়ে একটু হালকা কাজ চেয়েছিলেন ওই চন্ডাল লেখোয়াড়।

চাকরি স্হানান্তরিত করার অনুরোধ নিয়ে বছরের পর বছর এ অফিস থেকে ও অফিসে ছুটে বেড়িয়েছিলেন ওই বর্নঘৃনিত লেখোয়ার। ২০১৪ থেকে ঘুরছে। ৮৬ বার বিকাশ ভবনে হত্যে দিয়েছেন।

কেউ কিছু করেনি।
না।
কারও জন্যই আজ আর
কেউ কিছু করেনা।

ফলে ভয়ঙ্কর অন্ধকার নেমে আসে ওই চন্ডাল লেখোয়াড়ের জীবনে।
না খেতে পাওয়া মানুষ কোনও লড়াই জিততে পারেনা। স্বাভাবিকভাবেইপেটে ভাত না থাকলে সাহিত্য সৃষ্টির পুরস্কার ধুয়ে জল খাবেন লেখোয়াড়❓❓❓

কঠোর সিদ্ধান্ত নেয় চন্ডাল লেখোয়াড়। বাংলা অ্যাকাদেমী থেকে শুরু করে সমস্ত প্রাপ্ত পুরস্কার ফিরিয়ে দেবেন।এবং বাংলা অ্যাকাদেমী থেকে তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষীদের নিয়ে মিছিল করে তাঁর জীবনের দুঃসহ যন্ত্রণার কথা তুলে ধরবেন। লম্বা লকডাউনের জন্য মিছিলের সময় পরিবর্তন করতে হয় ব্রাত্য লেখোয়াড়কে। ওই লেখোয়াড়ের জীবনের কষ্টকর ও দুর্গম যাত্রার খবর পৌঁছে যায় রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কাছে। এবার শিকে ছেড়ে চন্ডাল লেখোয়াড়ের।

অবশেষে সাহিত্যিক তথা রাজ্যের স্বরাষ্ট্র সচিব আলাপন বন্দোপাধ্যায়ের ফোন আসে ওই চন্ডাল লেখোয়ারের কাছে। ফোনে লেখোয়ারকে আলাপন বন্দোপাধ্যায় জানান, “মুখ্যমন্ত্রী উদ্যোগ নিয়ে আপনাকে হালকা কাজে বদলি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন”। চন্ডাল লেখোয়াড় তাঁর আত্মজীবনী লিখছেন-’ অন্ধকার অতীত অজানা ভবিষ্যত’ যার শেষ অংশ লেখা চলছে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় লেখোয়াড়কে হালকা কাজ দিয়ে তাঁর “অন্ধকার অতীত, অজানা ভবিষ্যত” এর অভিমুখ ঘুরিয়ে সুখদ পরিসমাপ্তি ঘটিয়ে দিলেন।

ফলে মুছে যাবে তাঁর দীর্ঘ জীবন-যন্ত্রনার কিছু বাস্তব চিত্র।

কে এই লেখোয়াড়❓❓

কারণ মুখ্যমন্ত্রী লেখোয়াড়কে নতুন জীবন প্রদান করলেন।

এই চন্ডাল নিজেকে লেখক বলতে রাজি নন। তিনি নিজেকে লেখোয়াড় বলেন। ওই চন্ডাল-অস্পৃশ্য লেখোয়াড়ের নাম মনোরঞ্জন ব্যাপারী। রাঁধুনি থেকে লাইব্রেরীর কাজে উত্তরোন হল মনোরঞ্জন ব্যাপারীর জীবন।

মনোরঞ্জন ব্যাপারীকে কেউ কেউ বাংলার ‘ম্যাক্সিম গোর্কি’ বলে অভিহিত করলেও, পন্ডিত ব্যাক্তিরা এ বিষয়ে কোনো আলোকপাত করেননি, তাই চন্ডাল লেখোয়াড়ের বলিষ্ঠ লেখার কথা আমজনতা আর সেভাবে জানতে পারেনি। কিন্তু একটা মিলতো মানুষের সাদা চোখে ধরা পড়ছে, গোর্কি’র মতোই আক্ষরিক অর্থেই একদম মাটি থেকে উঠে আসা প্রথাগত শিক্ষার ন্যুনতম সুযোগ বঞ্চিত মানুষটি জীবনের বহুবিচিত্র লড়াই অভিজ্ঞতার সারসংকলন কালির আঁচড়ে বিধৃত করে এতগুলো মলাটে আবদ্ধ করতে পেরেছেন।

তাঁর এই কলমের মজদুরী তাঁর কঠোর জীবন সংগ্রামেরই ফসল, রিক্সা চালানো থেকে জ্বলন্ত উনুনের সামনে দিনের পর দিন সেদ্ধ হওয়া, জেলখানার অভিজ্ঞতা থেকে শঙ্কর গুহনিয়োগীর মতো সংগ্রামীর সহযোদ্ধা হওয়া সবকিছু তাঁকে নিছক লেখক নয় লেখোয়াড়ে পরিণত করেছে, শৌখিন শখের সাহিত্য চর্চা করার সুযোগ তিনি পাননি এটা সহজেই বোঝা যায়, হয়তো এটাই তাঁর শক্তির দিক।

দারিদ্র্য, জাতিগত নিষ্পেষণ, চুড়ান্ত প্রতিকুলতার মধ্যেও জ্ঞানার্জনের অদম্য স্পৃহা, সমাজের ঘটনাবলীর সচেতন পর্যবেক্ষণ, অংশগ্রহণ সবকিছু মিলিয়ে তাঁর এই আজকের অর্জন। তাঁর সৃষ্টিসমুহ সমাজের প্রগতিশীল চিন্তাশীল অংশের মনোযোগ দাবি করে, কারণ তাঁর মত তৃনমূল স্তর থেকে উঠে আসা মানুষের লড়াই, অভিজ্ঞতা, কাজের সদর্থক মুল্যায়ন, সীমাবদ্ধতা থাকলে তা চিহ্নিতকরণ, যদি যোগ্য মানুষেরা করেন তবে সেটা আগামী দিনের সমাজ পরিবর্তনের কাজে সহায়ক হতে পারে।।

কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ সাধন ঘোষ এবং মনোরঞ্জন ব্যাপারী।।

চন্ডাল_লেখোয়াড়

লেখক_সাহিত্যিক

মনোরঞ্জন_ব্যাপারী

The_Hindu_Prize

Leave a Comment